শিকড়ের গল্প

ডুমুরিয়া উপজেলার ইতিহাস

উপজেলার উৎপত্তি, মুক্তিযুদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব আর ঐতিহাসিক ঘটনা — সময়ের ধারায় সাজানো।

১৬ টি অধ্যায়
১৪ টি ইউনিয়ন

খুলনা জেলার সর্ববৃহৎ উপজেলা ডুমুরিয়া — আয়তন ৪৫৪.২৩ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১৪টি। ভদ্রা, হরি ও শিবসা নদী আর বিল ডাকাতিয়ার জলাভূমি ঘিরে গাঙ্গেয় বদ্বীপ সমভূমিতে গড়ে উঠেছে এই জনপদ। নীলকুঠির ঔপনিবেশিক স্মৃতি, ১৯৪৮ সালের তেভাগা আন্দোলন আর ১৯৭১ সালের ২০ মে চুকনগরের গণহত্যা এই অঞ্চলের ইতিহাসকে গভীরভাবে চিহ্নিত করেছে। আজ কৃষি, মাছ-চিংড়ি আর ঘেরের পাড়ে সবজি চাষে ডুমুরিয়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিনির্ভর উপজেলা।

নামকরণ

ডুমুরিয়া নামের উৎস

ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী এলাকায় ডুমুর গাছের আধিক্য থেকেই “ডুমুরিয়া” নামের উৎপত্তি। স্থানীয়ভাবে আরও কিছু মত প্রচলিত আছে, তবে কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে সেগুলো পাওয়া যায়নি — তাই এটিকে প্রচলিত ব্যাখ্যা হিসেবেই দেখা উচিত।

সূত্র: Wikipedia

প্রাচীনকাল

প্রাচীন জনপদ

ডুমুরিয়া গাঙ্গেয় জোয়ার-ভাটার বদ্বীপ সমভূমির অংশ — ভদ্রা, হরি, শিবসা নদী আর বিল ডাকাতিয়ার জলাভূমি ঘিরে এখানে জনপদ গড়ে ওঠে। স্থানীয় সূত্রে ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে দশম শতকে এ অঞ্চল “ভরত রাজা”-র শাসনাধীন থাকার কথা বলা হয়, যা কেশবপুরের ভরত ভায়নার সঙ্গে যুক্ত। প্রাচীনকালে বাগদি ও বাছাড় জনগোষ্ঠীর বসবাসের উল্লেখও পাওয়া যায়। (এই অংশ দ্বিতীয় স্তরের সূত্রনির্ভর)

সূত্র: বাংলা উইকিপিডিয়া · Banglapedia: Beel Dakatia

পঞ্চদশ শতক

শেখ শাহ আফজাল ও আরশনগর

স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি হযরত শেখ শাহ আফজালের মাধ্যমে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার হয়। মাগুরাঘোনা ইউনিয়নের আরশনগরে তাঁর মাজার ও মসজিদ রয়েছে; বাংলাপিডিয়াতেও আরশনগর মসজিদ উপজেলার উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত।

সূত্র: বাংলাপিডিয়া · বাংলা উইকিপিডিয়া

সপ্তদশ শতক – ব্রিটিশ আমল

জমিদারি বাঁধ ও নীলকুঠি

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী সপ্তদশ শতক থেকেই বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলে জমিদাররা অস্থায়ী নিচু বাঁধ ও কাঠের স্লুইস গেট দিয়ে লোনা পানি ঠেকিয়ে চাষাবাদ রক্ষা করতেন। ব্রিটিশ আমলের নীল চাষের স্মৃতি হিসেবে চেঁচুড়ী নীলকুঠি ও চুকনগর নীলকুঠি আজও উপজেলার প্রত্নসম্পদ হিসেবে তালিকাভুক্ত।

সূত্র: Banglapedia: Beel Dakatia · বাংলাপিডিয়া

১৮৮০

আধুনিক শিক্ষার সূচনা

উপজেলার প্রাচীনতম উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রঘুনাথপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৮ সালে মধুগ্রাম সিনিয়র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়; একই গ্রামের ঐতিহাসিক মধুগ্রাম ডাকবাংলোও উপজেলার প্রত্নসম্পদের তালিকায় আছে।

সূত্র: Banglapedia

১৯১৮

ডুমুরিয়া থানা গঠন

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ১৯১৮ সালের ২৫ মার্চ ডুমুরিয়া থানা গঠিত হয়।

সূত্র: বাংলাপিডিয়া · Banglapedia

১৯৪৮

তেভাগা আন্দোলন

১৯৪৮ সালে শোভনা, ধানিবুনিয়া, কানাইডাঙ্গা, ওড়াবুনিয়া ও বকুলতলাসহ বিভিন্ন গ্রামে বর্গাচাষিরা ফসলের দুই-তৃতীয়াংশের দাবিতে তেভাগা আন্দোলনে অংশ নেন।

সূত্র: বাংলাপিডিয়া · Wikipedia

১৯৫৯ – ষাটের দশক

পোল্ডার, বাঁধ ও জলাবদ্ধতার শুরু

১৯৫৯ সালে সরকার স্থায়ী পোল্ডার নির্মাণ কর্মসূচি শুরু করে। ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্লুইস গেট, পোল্ডার ও বাঁধ নির্মাণ করে — জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা ঠেকাতে। পরে এগুলোই নদী ভরাট ও বিল ডাকাতিয়ার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সূত্র: Banglapedia: Beel Dakatia · The Daily Star

১৯৬৯

উচ্চশিক্ষার বিস্তার

১৯৬৯ সালে শাহপুর মধুগ্রাম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় — উপজেলার প্রাচীনতম উল্লেখযোগ্য কলেজ। পরে অনুকূলচন্দ্র সংস্কৃত কলেজ (১৯৭৬) ও ডুমুরিয়া কলেজ (১৯৮৩) প্রতিষ্ঠিত হয়।

সূত্র: Banglapedia

১৯৭১

মহান মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানি বাহিনী কালীতলাপাড়ায় আক্রমণ চালায়; প্রফুল্ল কুমার বিশ্বাস, ইন্দুভূষণ, লালচাঁদসহ অনেকে শহীদ হন। শলুয়া বাজার, পলুয়া বাজার ও শোভনার গাবতলায় যুদ্ধ হয়। খুলনা অঞ্চল ছিল ৯ নম্বর সেক্টরের অধীন; খুলনা শহর মুক্ত হয় ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ — দেশের বাকি অংশের এক দিন পরে।

সূত্র: বাংলাপিডিয়া · Wikipedia · The Daily Star

২০ মে ১৯৭১

চুকনগর গণহত্যা

আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগর ভদ্রা নদীর তীরে — ভারতগামী শরণার্থীদের ট্রানজিট পয়েন্ট। ২০ মে সকালে পাকিস্তানি সেনারা স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে এসে কয়েক ঘণ্টা ধরে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষের ওপর গুলি চালায়; অনেকে ভদ্রা নদীতে ডুবে মারা যান। নিহতের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে — স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের হিসাবে ১০,০০০–১২,০০০, লাশ সরানোর কাজে যুক্ত একজনের হিসাবে প্রায় ৪,২০০। এটিকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বৃহৎ গণহত্যা বলা হয়; দিনটি “চুকনগর গণহত্যা দিবস” হিসেবে পালিত হয়।

সূত্র: Wikipedia: Chuknagar massacre · TBS · Dhaka Tribune

১৯৮৩

উপজেলায় উন্নীত

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে ১৯৮৩ সালে ডুমুরিয়া থানা উপজেলায় উন্নীত হয়। একই বছর ডুমুরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

সূত্র: বাংলাপিডিয়া · Banglapedia

১৯৯০-এর দশক – ২০০৬

বিল ডাকাতিয়া ও চুকনগর স্মৃতিসৌধ

বিল ডাকাতিয়া (পোল্ডার ২৫, প্রায় ১৯,৪৩০ হেক্টর) ডুমুরিয়া ও ফুলতলা জুড়ে বিস্তৃত। নদী ভরাটে প্রায় ৯,০০০ হেক্টর জমি ডুবে যায়; ১৯৯৫ সালে সলমারী নদী খননে প্রায় ৫,০০০ হেক্টর মুক্ত হলেও বাকি অংশে জলাবদ্ধতা রয়ে যায়। চুকনগরে শহীদদের স্মরণে ২০০৬ সালে “চুকনগর শহীদ স্মৃতিসৌধ” নির্মিত হয়।

সূত্র: Banglapedia: Beel Dakatia · Dhaka Tribune

১৯৯১ – ২০২২

জনসংখ্যা ও শিক্ষার অগ্রগতি

আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা: ১৯৯১ — ২,৫৬,৫০৩; ২০০১ — ২,৭৯,৮৬২; ২০১১ — ৩,০৫,৬৭৫; ২০২২ — ৩,৪৩,৮৯৯ (৮৭,৯৫৩ খানা)। সাক্ষরতার হার ২০১১ সালের ৫২.৬% থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৭৫.৯৭%। আয়তন ৪৫৪.২৩ বর্গকিমি — খুলনা জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা; ১৪টি ইউনিয়ন।

সূত্র: citypopulation.de · Wikipedia · বাংলাপিডিয়া

সাম্প্রতিক কাল

নদী রক্ষা, জলাবদ্ধতা ও কৃষির রূপান্তর

২০২১ সালে হাইকোর্ট ভদ্রা ও হরি নদীর জমিতে দখল, ভরাট ও ইটভাটার ওপর স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়ে সীমানা জরিপের নির্দেশ দেয়। ২০২৪ সালের আগস্ট–অক্টোবরের টানা বৃষ্টিতে বিল ডাকাতিয়া এলাকায় প্রায় দুই মাস জলাবদ্ধতা থাকে। একসময়ের চিংড়ি-নির্ভর এলাকায় কৃষকেরা এখন শিম ও নানা সবজি চাষে ঝুঁকছেন; এখানকার সবজি ইউরোপের কয়েকটি দেশেও রপ্তানি হয়।

সূত্র: The Daily Star · TBS · The Daily Star

ঐতিহ্য

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ও প্রত্নসম্পদ

ব্যক্তিত্ব: লে. কর্নেল এইচ এম এ গফফার, বীর উত্তম (আরাজি-সাজিয়াড়া; মুক্তিযুদ্ধে ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক, পরে মন্ত্রী); নারায়ণ চন্দ্র চন্দ (জন্ম ১৯৪৫, খুলনা-৫ আসনের সাংসদ ও মন্ত্রী); খান টিপু সুলতান (ধামালিয়া; সাংসদ)।

প্রত্নসম্পদ ও দর্শনীয় স্থান: চেঁচুড়ী নীলকুঠি, চুকনগর নীলকুঠি, মধুগ্রাম ডাকবাংলো, চুকনগর বধ্যভূমি ও শহীদ স্মৃতিসৌধ, আরশনগর মসজিদ, ডুমুরিয়া কালী মন্দির, দেলভিটা দুর্গা মন্দির, তালতলা মঠ, প্রহ্লাদ আশ্রম।

সূত্র: Wikipedia: H. M. A. Gaffar · Wikipedia: Narayan Chandra Chanda · Wikipedia: Khan Tipu Sultan · বাংলাপিডিয়া

এই পাতায় কোনো তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ?

লগইন ছাড়াই জানাতে পারেন — সংশোধন হলে আপনার নাম এখানে ধন্যবাদসহ দেখানো হবে।